মহিলারা কখন রোজা ছাড়তে পারেন
মমিনুল ইসলাম মোল্লাহায়েযের রক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মহিলারা রোজা ছেড়ে দিতে হয়। তারপর ভালভাবে পবিত্র হওয়ার পর তারা নামায- রোজা আদায় করতে পারেন।
বর্তমানে ঋতু¯্রাব ও প্রসুতি অবস্থার ক্ষেত্রে মহিলাদের সমস্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। নবিজীর আমলে এত সমস্যা ছিল না। এসব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে জন্মনিরোধ জাতীয় পিল ব্যবহার। তাই সময়ে অসময়ে রক্তপাত হয়। এতে মহিলারা অনেক সময় বিভ্রান্ত হন। ইফতারের পর রক্তপাত হলে কেউ কেউ মনে করেন তার রোজা নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ ইফতারতো দূরের কথা সূর্যাস্তের পর পরই যদি তার ঋতু¯্রাব আসে, তারপরও তার সেদিনের রোযা পূর্ণ এবং শুদ্ধ হবে। কোন মহিলা যদি রক্ত আসার ভাব /অনুভব করে অথবা তার অভ্যাস অনুযায়ী ব্যাথা অনুভব করে অথচ সূর্যাস্তের পূর্বে রক্ত বের না হয় তাহলে তার ঐদিনের রোজা শুদ্ধ হবে। ফরজ রোজা হলে তা আর কাযা করতে হবে না। নামাযের সময় শুরু হওয়ার পর যদি কেউ রক্ত দেখতে পায় হয় তাহলে পবিত্র হওয়ার পর সে ঐ ওয়াক্তের নামাজ কাযা করতে হবে। যদি সে ঐ ওয়াক্তের নামায আদায় করে না থাকে। এব্যাপারে রাসূল সাঃ বলেন, য়ে ব্যক্তি নামাযের এক রাকাত পেল, সে পুরো নামাযই পেল। ( বোখারি)। মহান আল্লাহ বলেন, “ অতপর যখন তোমরা নিরাপদ হও তখন তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর। নিশ্চয়ই নামায বিশ্বাসীগণের উপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত ( আন নিসা-১০৩ ) । পবিত্রতার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করা যাবে না। রক্ত শুকিয়ে গেলেও নিশ্চিত পবিত্রতা অর্জণের আগেই তাড়াহুড়ো করে গোসল করা উচিত নয়। একারণে মহিলা সাহবীগণ আয়েশা রাঃ এর নিকট রক্তযুক্ত তুলা পাঠাতেন আর তখন তিনি বলতেন, “ সাদা জাতীয় পদার্থ না দেখা পর্যন্ত তোমরা তাড়াহুড়া করে কিছু করবে না ( বোখারি)। যেদিন হায়েজ-নিফাসের কারণে প্রথম রোজা ভাঙ্গা গেল ওই দিন রোজার সম্মনার্থে ইফতার পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা ভালো। পরে এ রোজা কাযা করে করবে। এব্যাপারে কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করা যায়। “ এ হচ্ছে আসল ব্যাপার ( এটি বুঝে নাও) আর যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারিত রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখায়, তার সে কাজ তার অন্তরের আল্লাহ ভীতির পরিচায়ক ( সুরা হজ্জ- ৩২)। ঋুুতুবতী ও প্রসুতি মহিলারা রমজান মাসে দিনের বেলায় খাওয়া দাওয়া করতে পারবেন। তবে উত্তম হলো যদি তাদের নিকটে কোন ছোট ছোট ছেলে মেয়ে থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে খানাপিনা গোপনে করা উচিত। কেননা প্রকাশ্যে খেলে তাদের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
কোন মহিলা যদি রক্ত দেখতে পায় কিন্তু সে নিশ্চিত নয় যে সেটা রক্ত¯্রাবের রক্ত তাহলে ঐদিনের রোযা শুদ্ধ হবে । কেননা নারীর ঋতু স্পষ্টভাবে দেখা দিলে সে রোজা ছেড়েে দেবে। প্রত্যেক মহিলাকে তার ঋুুতুর সময়ের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। এব্যাপারে উদাসিন হলে চলবে না। কোন কোন সময় মহিলারা রক্তের সামান্য আলামত দেখতে পায় অথবা সারাদিনে বিচ্ছিন্নবাবে খুব অল্প কয়েক ফোঁটা রক্ত দেখতে পায়। আর এটা সে কখনও প্রত্যেক মাসের ঋতু¯্রাবের নির্ধারিত সময়ে কিন্তু ঋতু না আসা অবস্থায় দেখতে পায় , আবার কখনও অন্য সময় দেখতে পায়। তাহলে ঋতু¯্রাবের রক্ত বলে নিশ্চিত হলে সে রোজা ছেড়ে দেবে। ইস্তেহাযা মহিলাদের এধরণের রোগ। এতেও রক্ত প্রবাহিত হয়। এটি এমন রক্ত যা ঋতু ¯্রাব ও প্রসুতির সময় ছাড়া অন্য সময়ে বের হয় হয় অথবা এ দু অবস্থার পরপরই বের হয়। সে কারণে কোন মহিলার হায়েয ও নিফাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলে যদি ঐ সময়সীমা অতিক্রম করে তার রক্ত চলে তাহলে তাকে ইস্তেহাযা বলে। এটি মূলত এক ধরণের রোগ। ইস্তেহাযা অবস্থায় মহিলারা নিজ ঘরে ওয়াজিব , সুন্নত, ও নফল ইতিকাফ করতে পারেন। এ অবস্থায় রোজা রাখা সহীহ এবয় জরুরী রোজা না রাখার অনুমতি নেই। কোনটা হায়েযের রক্ত আর কোনটা ইস্তেহাযার রক্ত তা মা-বোনদের বুঝতে হবে। এ দুয়ের মধ্যে কয়েকটা সুস্পষ্ট পার্থক্য হলো ১. ইস্তেহাযা লাল রঙের হয় পক্ষান্তরে হায়েজ হয় কালো রঙের অথবা গাঢ় লাল ( প্রায় কালো) রঙের। ২. ইস্তেহারায় গন্ধ থাকে না। পক্ষান্তরে হায়েজের দুর্গন্ধ থাকে। ৩. ইস্তেহারার রক্ত বের হওয়ার পর জমাট বদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হায়েয কখনও জমাটবদ্ধ হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হায়েয প্রচুর পরিমানে হয়। কিন্তু ইস্তেহাযা কম পরিমানে হয়। ৫. হায়েজ পেট ব্যাথার সৃষ্টি করে কিন্তু ইস্তেহাযা বেদনা সৃষ্টি করে না। ৬. হায়েয খুব গাঢ় হয়। কিন্তু ইস্তেহাযা পাতলা হয় ইত্যাদি দেখলে একজন মহিলা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কখন রোজা ছাড়বেন। ইস্তেহাযাগ্রস্ত মহিলা শুধুমাত্র অন্যান্য মাসের ঋতু¯্রাবের দিনগুলোর সমপরিমান সময় অপেক্ষা করবে এবং এরপর বাকী দিনগুলোতে গোসল করে নামায আদায় করবে। যদি রমযান মাসে দিনের বেলায় কোন মহিলার সামান্য রক্তের ফোঁটা পড়ে এবং সারা রমযান এই রক্ত চালু থাকা অবস্থায় সে রোযা রাখে তাহলে তার রোযা শুদ্ধ হবে। এ রক্ত শিরা থেকে আসে। আলী (রাঃ )থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন, এই রক্ত বিন্দুগুলো নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মত এগুলো ঋতু¯্রাব নয়। ”এজন মহিলার যতদিন সাধারণত ঋতু থাকে। ততদিন পার হওয়ার পর সে যদি রক্তমুক্ত হয় তাহলে গোসল করে পবিত্র হয়ে যাবে। এর দু তিনদিন পর যদি আবার শুরু হয় তা মূলত রক্ত¯্রাব নয়। কেননা একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় একজন মহিলার পবিত্র থাকার সর্বনি¤œ মেয়াদ হচ্ছে ১৩ দিন। অর্থাৎ দুই হায়েযের মাঝে ১৩ দিন ব্যবধান থাকবে। রমযানের দিবসে গর্ভবতী মায়ের রক্ত বের হলে রোযায় কোন প্রভাব ফেলবে কি না এ নিয়ে অনেকে চিন্তায় পড়ে যান। এব্যাপারে কোন মহিলা রোযা থাকা অবস্থায় যদি তার ঋুুতুর রক্ত আসে তাহলে তার রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। রাসুল সাঃ বলেন, “ মহিলার বিষয়টা কি এমন নয় যে, যখন সে ঋুুবতী হয় , তখন সে নামায আদায় করে না এবং রোযা রাখে না ( বুখারি, রোজা অধ্যায়) ? ধারাবহিক ভাবে রোযা পালনের সুবিধার্থে অনেক মা- বোন পিল খেয়ে ঋতু বন্ধ করতে চান। এ ব্যাপারে আলেমদের বক্তব্য হচ্ছে- তা করা যেতে পারে। তবে ডাক্তারগণের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত যে এতে মহিলাদের ক্ষতি হতে পারে তাই আদম সন্তানের নারীকূলের জন্য যে বিধান দেয়া হয়েছে তা মেনে নেয়াই ভাল। গর্ভপাত হওয়ার পর কত দিন নামায - রোযা থেকে একজন নারী বিরত থাকবে ? এ ধরণের প্রশ্ন প্রায়শই শোনা যায় গর্ভপাত সন্তান আকৃতি ধারণ এর পূর্বে বের হলে সেই রক্তকে প্রসূতি অবস্থার রক্তগণ্য করা হবে না। বরং সেটা কুরক্ত। হিসাবে বিবেচিত হবে এবং এটি তাকে নামায - রোযা থেকে বিরত রাখবে না। বিশেষজ্ঞ মহল বলেন, বাচ্চা অঅকৃতি ধারণ এর সর্বনি¤œ সর্ব¤িœ সময় ৮১ দিন। ঋতুগ্রস্ত নারীর ঋুুর শেষ দিনগুলোতে পবিত্র হওয়ার পূর্বে মহিলারা সাধারণত রক্তের চিহ্ন দেখতে পায় না। এক্ষণে সাদা জাতীয় পদার্থ ( যা ঋুুর শেষের দিকে কোন কোন মহিলার হয়ে থাকে) না দেখা সত্তেও সে রোজা রাখবে। পক্ষান্তওে সাদা জাতীয় পদার্থ দেখা যদি তার অভ্যাস হয়ে থাকে তাহলে তা না দেখা পর্যন্ত সে রোযা রাখবে না। কোন মহিলারমঋতু¯্রাবের সময়সীমা যদি প্রত্যেক মাসে আট অথবা সাত দিন হয় কিন্তু দেখা গেল মাঝে মধ্যে অভ্যাসভঙ্গ কওে ২/১ দিন বেশী সময় ধওে ঋতু¯্রাব চলে তাহলে সে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তিনি সিয়াম পালন করতে পারবেন না। কেননা নবী সাঃ ঋতু¯্রাবের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেননি। অধর অধল্লাহতায়ালা বলেছেন, - তারা ওুামাকে মহিলাদেও ঋতু¯্রাব সমএন্ধ জিজ্ঞেস কওে তুমি বলে দাও সেটা হচ্ছে কষ্টদায়ক বস্তু। ( সুরা অধল বাকারা ২২২)সুতরাং এই রক্ত থাকাকলীন সময়ে মহিলারা আপন অবস্থায় থাকবে , তারপর ভাল হয়ে গেলে গোসল কওে নামায ও রোজা পালন করবে। তেমনিভাবে পরবর্তী মাসে যদি গত মাসের তুলনায় কম দিনে ঋতু বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে গোসল কওে নিবে এবং নামায রোজা সহবাসসহ যথানিয়মে সকল কাজ করতে পারবে। গর্ভবতী মহিলা যদি সন্তান প্রসবের ২/১ দিন আগে রক্ত দেখতে পায় এবং তার সাথে প্রসব বেদনা থাকে, তাহলে এটি প্রসূতি অবস্থার রক্ত। এ কারণে সে নামায -রোযা পরিত্যাগ করবে। কিন্তু যদি তার সাথে প্রসব বেদনা না থাকে, তাহলে এটি কুরক্ত। এ রক্ত তাকে নামায রোযা থেকে বিরত রাখবে না। গর্ভবতী রোজাদার মহিলারা যদি রোযা রাখার কারণে বাচ্চার জীবন নাশের আশংকা থাকে তবে রোজা ভেঙ্গে ফেলা জায়েজ। শুধুমাত্র দুধ কম পাবে এ অজুহাতে রোজা ভঙ্গ করা যাবে না। পরবর্তীতে এ রোযা কাযা করতে হবে। সদ্য সন্তান প্রসবকারিনী নারী চল্লিশ দিনের আগে যখনই পবিত্র হবে তখনই তার উপর রোজা অপরিহার্য হবে। কিন্তু যদি তাা ৬০ দিনের বেশি সময় ধরে চলে তাহলে বুঝতে হবে সে ইস্তেহাযাগ্রস্ত মহিলা। ঘোলা বা হলুদ রঙের রক্ত বের হলে অথবা ২/১ ফোঁটা যে রক্ত আসবে অথবা সামাণ্য যে সিক্ততা অনুভ’ত হবে, সেগুলো আসলে ঋতু¯্রাব নয়। সে কারণে ্এগুলো তাকে নামায-রোযা থেকে বিরত রাখবে নাএবং স্বামীকে স্ত্রীসহবাস থেকেও বাাঁধা দিবে না। উম্মে আতিয়া রাঃ বলেন, “ ঘোলা বা হলুদ রঙের যা বের হয় তাকে আমরা কিছুই গণ্য করতাম না ( বুখারি)। কখন রক্ত বন্ধ হল কখন নামায রোযা করতে হবে এ নিয়ে মা-বোনেরা সন্দেহে পতিত হন। এজন্য বড় বোনদের নিকট থেকে বাস্তবসম্মত জ্ঞান নেয়া উচিত। কেননা ভুল হলে খেসারত দিতে হবে। বুখারি ও মুসলিমের বর্ণিত হাদিসের নিয়মানুযায়ী গোসলের পদ্ধতি হচ্ছেঃ প্রথমে নিয়ত করবে,অতঃপর বিসমিল্লাহ বলে দু হাত কব্জি পর্যন্ত তিন বার ধৌত করবে। লজ্জাস্থানে পানি ঢেলে উহা পরিষ্কার করবে। তারপর পূর্ণরুপে উযু করবে। মাথায় পানি ঢেলে আঙ্গুল চালিয়ে চুল খিলাল করবে। যখন বুঝবে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে গেছে তখন মাথায় তিনবার পানি ঢালবে এবং সমস্ত শরীওে পানি ঢালবে। এক্ষেত্রে ডান সাইড থেকে কাজ আরম্ভ করবে ( আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত) ।
আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত, জনৈকা নারী তাকে জিজ্ঞেম করলো, ঋুুতুবতী নারী রোযার কাযা করে অথচ সালাতের কাযা করেনা। তিনি বল্লেন, আমাদের রোযা কাযা করার আদেশ দেয়া হয়েছে , আর সালাত কাজা করার আদেশ দেয়া হয়নি ( বুখারি ৩২১/৩৩৫)। একজন প্রসূতি মহিলা যদি সাতদিন রোযা ভাঙ্গে , স্তনদানকারিনী হিসাবে পরবর্তী রমজানের সাতদিন অতিবাহিত করে তথাপিও অসুস্থতার অজুহাতে কাযা করেনি তৃতীয় রমজান ও এসে গেছে এমন হলে তার সমাধান হলোঃ সে যদি সত্যিই অস্স্থু হয়ে থাকে এবং কাযা আদায় করতে সক্ষম না হয়, তাহলে যখনই সক্ষম হবে তখনই সমস্ত কাযা আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি তার ওযর না থাকে বরং অহেতুক অজুহাত দেখায় এবং বিষয়টা তুচ্ছ জ্ঞান করে তাহলে তার জন্য এক রমযানের কাযা অন্য রমযান পর্যন্ত বিলম্বিত করা বৈধ নয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখল এবং এ রোজার পর শাওয়াল মাসে ৬টি রোজা রাখল সে যেন গোটা বছর রোজা রাখল ( মুসলিম-১১৬৪)। হাদিস অনুযায়ী আগে ভাংতি রোজা পূরণ করতে হবে এবং পরবর্তীতে শাওয়ালের ৬ রোজা থাকতে হবে।
লেখকঃ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক , সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক,
কুমিল্লা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন